ইনাতগঞ্জ বার্তা ডেস্কঃ আমার বোরকা লাগতো নায়, বাবা তুমি ফিরে আও, তোমারে আর কোন দিন বোরকার কথা কইতাম নায়, তুমি আইলেই অইবো।’ ৫ই আগষ্ট বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণকারী আজমত আলীর স্কুল পড়ুয়া মেয়ে নাহিদা আক্তার এভাবেই সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করতে গিয়ে বাবার স্মৃতি মনে করে বারবার কাঁদছিলেন। ৪ আগষ্ট তার বাবার সাথে সবশেষ মুঠোফোনে কথা হয়েছিল নবীগঞ্জ ম্যাপল স্কুলের ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী নাহিদা আক্তারের। অন্যদিকে সম্প্রতি পবিত্র রমজান উপলক্ষ্যে শহীদ আজমদ আলীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ইফতার সামগ্রী ক্রয় করার জন্য পৌরসভার পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগীতা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন। আজমত আলীর স্কুল পড়ুয়া মেয়ে নাহিদা আক্তার জানান- ‘জীবিকার তাগিদে বিগত ৫ বছর ধরে তার পিতা আজমত আলী ঢাকায় বসবাস করে সেখানে মাছের ব্যবসা করেন। তিনি মাসে মাসে পরিবারের খরচ ও তাদের লেখা পড়ার খরচ পাঠাতেন। তা দিয়েই চলতো পরিবার। তার বোরকা পুরাতন হয়ে যাওয়ায় তার পিতাকে নতুন একটি বোরকা কিনে দেয়ার আবদার জানিয়েছিল, তখন তার পিতা আজমত আলী ফোনে জানিয়েছিলেন ঢাকায় এখন আন্দোলন চলছে সব কিছু বন্ধ। তিনি বাড়িতে আসবেন নয়তো দোকানপাঠ খুললেই ১ সপ্তাহের মধ্যেই বিকাশে বোরকার টাকা পাঠিয়ে দিবেন। কিন্তু পরের দিনই তার আজমত আলী এসব কথা বলে বারবার মুর্ছা যাচ্ছিলেন রবিরুন বেগম। রবিরুন বেগম আরো জানান, ‘ঢাকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ তাই তাকে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন এবং কোন মিছিল ও আন্দোলনে যেতেও নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তা মানেন নি আজমত আলী। তার ভাষ্য-স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এখনই আন্দোলনের সময়।’ রবিরুন বেগম কাদঁতে কাদঁতে বলেন- তার স্বামী হিসেবে স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি খুবই দায়িত্বশীল ছিলেন। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা পুড়ায়। যার কারনে ৫ বছর ধরে ঢাকায় মাছের ব্যবসা করতেন। তার স্বপ্ন ছিল ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেলো। অবুঝ মেয়েটি প্রতিনিয়তই তার বাবা’র কবরে পাশে গিয়ে কান্নাকাটি করে বলে, বাবা তুমি ফিরে এসো, আমার বোরকা লাগবে না। আমি কখনও তোমাকে বোরকার জন্য বলবো না বাবা। শহীদ হওয়ার প্রায় ৭ মাস অতিবাহিত হলেও এখনও কান্না থামছে না ওই শহীদ পরিবারের। এলাকাবাসী অসহায় শহীদ আজমত আলীর পরিবারের পাশে দাড়ানোর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
নবীগঞ্জ সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সমন্বয়ক ইসলাম ইফতি বলেন- ‘শহীদ আজমতের পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্দ্যোগ নেয়া জরুরী। যেহেতু পরিবারের সদস্যরা ছোট তাই বাড়ির পাশে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কোন খামার করে দেয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে জানতে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মোঃ রুহুল আমিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে শহীদ আমজত আলীর নাম। সরকারী সহায়তার বিষয়টা প্রক্রিয়াধীন আছে। ইতিমধ্যে আমরা শহীদ আমজত আলীর স্ত্রীর নামে সোনালি ব্যাংকে একটি একাউন্ট করিয়েছি এবং একাউন্টের তথ্য আমরা উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের বরাবরে প্রেরণ করেছি। আশা করছি জুলাই বিপ্লবে শহীদ পরিবার খুব শীঘ্রই সরকারী অনুদান পাবে।’
ইউএনও রুহুল আমীন আরো জানান, ‘গত ৩ মার্চ তাদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজ খবর নিয়েছি। রমজানে ইফতার সামগ্রী ক্রয় করার জন্য পৌরসভার ফান্ড থেকে ছোট একটা অনুদান প্রদান করেছি। তার মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা হবে।’ এদিকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিরা মার্চ থেকেই ভাতা পাবেন। প্রেস সচিব জানান, ৯ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদরা ‘জুলাই শহীদ’ এবং আহতরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে অভিহিত হবেন। আর মার্চ থেকেই ভাতা পাবেন ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধারা। ৮৩৪ জন জুলাই শহীদদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রতিটি জুলাই শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা পাবেন। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দেয়া হবে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাকি ২০ লাখ টাকার জাতীয় সঞ্চয়পত্র দেয়া হবে। এ ছাড়া শহীদ পরিবারকে প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া হবে এবং শহীদ পরিবারের সম সদস্যরা সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন অপরদিকে জুলাই যোদ্ধরা তিনটি মেডিক্যাল ক্যাটাগরি: ক্যাটাগরি-এ, ক্যাটাগরি-বি এবং ক্যাটাগরি-সি অনুযায়ী সুবিধাদি পাবেন।
Leave a Reply