গ্রাম প্রধান বাংলাদেশ, দেশের ৮০ ভাগ মানুষের বাস প্রত্যান্ত গ্রামে। দেশব্যাপী যতই উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাকনা কেন তার ছোঁয়া খুব কমই লেগেছে গ্রামে।
গ্রাম অঞ্চলের বসবাসরত মানুষগুলো বরাবই বঞ্চিত হতে হয়। বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত যেমন- স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এর সুযোগ এরা পাচ্ছে না। প্রত্যাশিতভাবে দেশের শহরাঞ্চলে কমবেশী উন্নয়ন হলেও গ্রামঅঞ্চল তা থেকে তুলনামূলক ভাবে বঞ্চিত।
ফলে শহর নগরবাসীর আর্তসামাজিক অবস্থা উন্নতি হলেও তেমন অবনতি হচ্ছে না, কিন্তু পল্লী অঞ্চলের বেশীরভাগ মানুষের উন্নতি হয়নি।
তাদের অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে। পল্লী এলাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে।
যেমন-চাউল, ডাল, গম, আলু,পাট, আখ, শাক-সবজি ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য সামগ্রী পল্লী এলাকা থেকেই উৎপাদন ও বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হচ্ছে। দেশের উন্নয়নে গ্রাম অঞ্চলের মানুষগুলো সব সময় বিরাট ভূমিকা রাখছে। ফলে উভয় এলাকার মানুষের মধ্যকার ব্যবধান বেড়েই চলছে।
এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে।
তার মধ্যে অসুখজনিত ব্যয় শষ্যে ক্ষতি, গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগী পালনে ক্ষতি, আবার ব্যবসায় মন্দা ও মূল্যবৃদ্ধি, কৃষিকাজে নিম্ন লাভজনক কথা জমি বন্ধক, যৌতুক প্রদান, ভোগ বেশি উপার্জন কম এবং ঋণের বেড়াজালে বন্দি অথবা অভাব-অনটন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী।
তার মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা ইত্যাদি তো রয়েছেই। যার ফলে প্রায় মৌসুমেই ফসল উৎপাদনে বেঘাত পেতে হয়।
ফলে কৃষকরা ফসল হারিয়ে বছরের পর পর মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়।
বিজ্ঞান-তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশব্যাপী প্রযুক্তির বন্যা বইলেও পল্লী অঞ্চলের অনেক এলাকা এখনো তা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সমস্যার মধ্যে চলছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের কর্মকান্ড।
প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় উ”চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। নামে মাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাতে লেখাপড়ার ন্যূনতম পরিবেশ নেই। শহর বন্দরের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থাকায় বিজ্ঞান ভিত্তিক জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে গ্রামীণ ছাত্র-ছাত্রীরা বরাবরই বঞ্চিত।
সাম্প্রতিককালে পল্লী অঞ্চলে নিম্নমানের ভেজাল সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে পরিণত হয়েছে।
খাদ্য সামগ্রী নিম্নমানের পণ্য মানুষ কিনছে বাধ্য হয়ে। শহরে ভেজাল বিরোধী অভিযান সহ নানান তৎপরতা থাকলেও পল্লী অঞ্চলের ছেট বড় হাটবাজারগুলোতে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালিত হয় না।
পল্লী অঞ্চলের মানুষ নিম্নমানের খাদ্যদ্রব্য খেয়ে পেটের পীড়া, জন্ডিস, অমেশা, ডায়রিয়া সহ নানা জটিল ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে হয়। অসচেনতা ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় বিজ্ঞান প্রযুক্তির যোগে মানুষ নানা কুসংস্কারের মধ্যে ডুবে আছে।
চিকিৎসা ও কুসংস্কারের কারণে অনেক মানুষ অকালে মারা যায়।
তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য জন্ডিস রোগের অপচিকিৎসায় অনেক মানুষ পল্লী এলাকায় প্রাণ হারাচ্ছে। আমাদের দেশে এ রোগের আক্রমণ অত্যন্ত বেশী।
এ রোগের চিকিৎসা হিসেবে বেছে নেয়া হয় ঝাড়-ফুঁক, পানি পড়া, ডাব পড়া, আখপড়া, তেলপড়া, গুরপড়া, গলায় মালা পড়া ইত্যাদি জন্ডিস রোগের উল্লেখিত চিকিৎসার পদ্ধতি। যার বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই। সামাজিক কুসংস্কারের কারণে পল্লী গ্রামের মানুষগুলো ব্যক্তিজীবন পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনে তারা এগিয়ে যেতে পারছেনা। তাদের দৈনন্দিন কাজে কর্মে, কথাবার্তায়, চলাফেরায়, ধর্ম, কর্মে, রাজনীতিতে, চিন্তা চেতনার সবকিছুতেই কুসংস্কার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাল্য বিবাহ, যৌতুক প্রথা, বাল্য বিবাহ অধিক সন্তানের কারণ।
তাদের পারিবারিক জীবনে অশান্তি কলহ লেগেই থাকে, শহর বন্দর এর তুলনায় গ্রাম অঞ্চলে যৌতুকের আবদার বেশী থাকায় দিনমজুর দরিদ্র পরিবারগুলো বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়।
মানুষ তাদের সংসার চালাতে গিয়ে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেনা। অন্যের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে ও বিয়ের টাকা যোগাতে পারছে না, যার ফলে দরিদ্র পরিবারের অনেক মেয়েরা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে, ঘৃণা আর কষ্টের জীবন যাপন করছে। এছাড়াও পল্লী এলাকায় খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি অসামাজিক অপকর্ম বৃদ্ধি পেয়েই চলছে।
শহর অঞ্চলে পুলিশ তৎপরতা থাকলেও পল্লী অঞ্চলে নেই বললেও কম হবে। ছাত্র, যুবসমাজ নেশার জগতে অন্ধকারে দাবিত হচ্ছে। মদ, গাজা, হেরোইন সেবন সহ জুয়া খেলা ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুব সমাজের চারিত্রিক অবক্ষয়ে ভবিষ্যত নিয়ে অভিভাবক মহল উদ্বিগ্ন, সামাজিক সংগঠনগুলি কিছু কিছু উদ্যোগ নিলেও শুধু শ্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরী। তাই মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে আরো সচেতন এবং পারিবারিক সুশিক্ষা ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম পেতে পারে সুস্থ সুন্দর ও আলোকিত জীবন।
লেখকঃ- আনিসুর রহমান ॥
Leave a Reply